আলী আমজাদের ঘড়ি – ঘড়ি


0

চাঁদনীঘাটওর সিঁড়ি,
আলী আমজাদওর ঘড়ি,
জিতু মিয়ার বাড়ি,
বঙ্কুবাবুর দাড়ি…

উপরের লাইনগুলো হুটহাট শুনলে পাগলের প্রলাপ মনে হওয়াটা বিচিত্র নয়। তবে নাহ, কথাগুলো নেহাতই পাগলের অর্থহীন প্রলাপ নয়, এর অর্থ আছে। উপরের এই লাইনগুলিতে সিলেট শহরের দ্রষ্টব্য যা কিছু, যেগুলি না দেখলেই নয়, সেগুলির কথাই বলা আছে।

Source: Wikimedia Commons

যাই হোক, ক্লক টাওয়ার জিনিসটা সবাই চেনেন আশা করি। একটা বিশাল টাওয়ার বা ভবনের মাথায় একটা প্রমাণ সাইজের ঘড়ি বসানো থাকে, যেটা দেখে মোটামুটি গোটা শহরের মানুষ সময় নির্ণয় করে। যেমন লন্ডনের বিগ বেন, কিংবা মক্কার মক্কা রয়্যাল ক্লক টাওয়ার, ইত্যাদি ইত্যাদি৷ এখন কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে কোথাও কি ক্লক টাওয়ার আছে? ঢাকায় যারা থাকেন তারা হয়ত অনায়াসে বলে দেবেন, “রাজউক ভবনেই তো আছে! নগরভবনেও আছে!” উত্তর ভুল নয়, এ দুটোকেও ক্লক টাওয়ার বলা যায়, কিন্তু এমন কোনো ক্লক টাওয়ার কি আছে, যেখানে ঘড়িটি কোনো ভবনের অংশ নয়, বরং ঘড়িটি রাখার জন্যই আলাদা করে একটি টাওয়ার তৈরি করা হয়েছে? এবার অনেকেই আটকে যাওয়ার কথা!

ুধু ঘড়ির জন্যই টাওয়ার তৈরি করা হয়েছে, বাংলাদেশের এমন একমাত্র ক্লক টাওয়ার রয়েছে সিলেটে, নাম, আলী আমজাদের ঘড়ি। এই ক্লক টাওয়ারটি আবার বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো ক্লক টাওয়ারও বটে। সিলেট শহরে যারা বেড়াতে আসেন এবং কীন ব্রিজ দিয়ে শহরে প্রবেশ করেন, তাদের মধ্যে খুব কম মানুষই আছেন যারা একবারের জন্য হলেও এই সুবিশাল ঘড়িটির দিকে তাকান না।

আলী আমজাদের ঘড়িটি সিলেট শহরের কোতয়ালিতে অবস্থিত। সুরমা নদীর তীরে কীন ব্রিজ আর সার্কিট হাউসের ঠিক পাশেই এর অবস্থান। লাল রঙের টিন দিয়ে তৈরি ঘড়িটির দিকে তাকালে কেমন জানি প্রাচীন একটা ভাব অনুভূত হয়৷ যারা আগে কখনও সিলেট আসেননি, তাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত দূর থেকে ঘড়িটিকে দেখে চার্চ বলে মনে করতে পারেন। ঘড়িটির গঠনও অনেকটা চার্চের মতই। 

আলী আমজাদের ঘড়িটির দৈর্ঘ্য মোটামুটি ৯ ফুট ৮ ইঞ্চি, প্রস্থ ৮ ফুট ১০ ইঞ্চি। মাটি থেকে প্রথমে টিনের চালওয়ালা লম্বাটে ঘরের মত একটা অংশ উঠে গেছে, যার ছাদ পর্যন্ত উচ্চতা ১৩ ফুট। এই ছাদের পরেই ঘড়িটির অবস্থান। ঘরের ছাদটি থেকে ঘড়ি অংশের উচ্চতা ৭ ফুট। ঘড়ি অংশের পরও টাওয়ারটির চূড়া আরও ৬ ফুট উঠে গেছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে টাওয়ারটির উচ্চতা দাঁড়ায় মোটামুটি ২৬ ফুট। ঘড়িটির ডায়ামিটার আড়াই ফুট, ঘড়ির কাঁটা দুই ফুট লম্বা। 

Source: sightbywalk.blogspot.­com

আলী আমজাদের ঘড়িটির ইতিহাস বেশ অনেকটাই ধোঁয়াটে। স্থানীয়দের কারও কারও মতে আলী আমজদ যখন দিল্লি যান,
তখন দিল্লির চাঁদনীচকে রাজকুমারীর সম্মানে নির্মিত বিশাল ঘড়িটি দেখে স্থির করেন,
সিলেটেও এমন একটি ঘড়ি বানানো দরকার। তাই সিলেট ফেরত আসার পর সুরমা নদীর তীরে তিনি এই ক্লক টাওয়ারটি বানানোর উদ্যোগ নেন৷ এই তথ্যটি সত্য হবার সম্ভাবনা অবশ্য খুবই কম। কারণ আলী আমজাদের ঘড়িটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৮৭৪ সালে, যখন আলী আমজাদের বয়স ছিলো মাত্র তিন বছর। 

অবশ্য এ নিয়ে অন্য আরেকটি কাহিনী আছে,
যেটি অধিক বিশ্বাসযোগ্য। সেই কাহিনীতে বলা হচ্ছে, ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ আমলে যখন সিলেটকে আসামের সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়, তখন গোটা সিলেটের মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে৷ তাদের সান্ত্বনা দেয়ার জন্য তৎকালীন বড়লাট লর্ড নর্থ ব্রুক সিলেট আসার পরিকল্পনা করেন৷ সেই বড়লাটকে স্বাগতম জানানোর জন্যই সিলেটের কুলাউড়ার পৃথিমপাশার জমিদার আলী আহমদ একটি ক্লক টাওয়ার এবং একটি বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করেন।

বিগ বেনের আদলে তৈরী আলী আমজাদের ঘড়িটি; Source: The Conversation

ক্লক টাওয়ারটি তৈরি হয় লন্ডনের বিগ বেন ক্লক টাওয়ারের আদলে। কলকাতা থেকে নামী কারিগর এনে টাওয়ারটি বানানো হয়। সেসময় সিলেট কিংবা সিলেটের বাইরে থেকেও বহু মানুষ ঘড়িটি দেখতে আসতো৷ পুরো সিলেট শহরের মানুষ এই ঘড়ির ঘন্টা শুনে সময় নির্ধারণ করতো। আজও শহর নীরব থাকলে শহরের যে কোনো জায়গা থেকেই এই ঘড়ির ঘন্টা শুনতে পাওয়া যায়। যাই হোক, আলী আহমদ নিজের পুত্র আলী আমজাদের নামে ক্লক টাওয়ারটির নাম রাখেন আলী আমজাদের ঘড়ি।

সেই থেকে আজ পর্যন্ত, প্রায় একশ পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে এই নামেই ঘড়িটি পরিচিত হয়ে আসছে৷ প্রথম প্রথম ঘড়িটিকে চাবি দিয়ে চালু রাখতে হতো। ঘড়িতে চাবি দেয়ার জন্য পৌরসভার একজন কর্মীও নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী ক্লক টাওয়ারটির যথেষ্ট ক্ষতি সাধন করে। 

মুক্তিযুদ্ধের পর পৌরসভার উদ্যোগে ঘড়িটি মেরামত করা হয়। কিন্তু তবুও কিছুদিনের মধ্যেই ঘড়িটি আবারও বন্ধ হয়ে যায়৷ এরপর ১৯৮৭ সালে আবারও ঘড়িটি মেরামত করা হলেও ঘড়িটি বেশিদিন চলে নি। এরপর বন্ধ অবস্থায় ঘড়িটি বহুদিন পড়ে ছিলো। ২০১১ সালে আরও একবার ঘড়িটি মেরামত করা হয়। অবশেষে ২০১৬ সালে শেষবার মেরামতের পর আবারও দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা চলতে শুরু করেছে ঘড়িটি। 

Source: touristplaces.com.bd

সুরমা নদীর তীরে এই প্রাচীন ঘড়িটি ১৪৫ বছর ধরে অতিথিদের অভ্যর্থনা করে আসছে, শহরবাসীকে জানিয়ে আসছে সময়। আশা করি, সামনের দিনগুলিতেও সচলাবস্থায় নিজের এবং শহরের গৌরব হিসেবে সসম্মানে মাথা উঁচু করে টিকে থাকবে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম এবং সর্বপ্রাচীন ক্লক টাওয়ার, আলী আমজাদের ঘড়ি!

তথ্যসূত্র—

 ১.  https://­www.daily-sun.com/­printversion/details/­335134/2018/09/11/­Ali-Amjad’s-Tower-Clo­ck
২. http://­sightbywalk.blogspot.­com/2011/10/­ali-amjad-khans-clock­-tower-oldest.html?m­=1
৩. https://scc.gov.bd/­niceplaces/­আলী-আমজাদের-ঘড়ি/
৪. http://gb-dak24.com/­2016/12/06/1845.php/

৫. https://bangla.tourtoday.com.bd/%E0%A6%86%E0%A6%B2%E0%A7%80-%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%98%E0%A7%9C%E0%A6%BF/ali-amjadir-ghori/

ফিচার ছবি- Wikimedia Commons


Like it? Share with your friends!

0
Josim Uddin

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *