কেন রোলেক্স এত দামী? – ঘড়ি


0

আপনারা যারা একাধিক ঘড়ি সংগ্রহে রাখতে পছন্দ করেন, উপহার হিসেবে ঘড়ি পেতে
চান, কোথাও যাবার আগে কোন ঘড়িটি পরলে আপনাকে সবচেয়ে ভালো মানাবে এটা নিয়ে ভাবেন
তারা অবশ্যই ঘড়ি প্রেমিক। আর একজন ঘড়ি প্রেমিক হিসেবে রোলেক্সের নাম কেউ শুনে নি
তা হতে পারে না। সুতরাং অবশ্যই হয়ত প্রশ্ন জাগে যে একটি রোলেক্সের দাম কেন এতো
বেশি? যেখানে আপনি ৫০০ টাকা খরচ করে একটি ঘড়ি কিনতে পারছেন সেখানে ৬ লক্ষ , ৮ লক্ষ
কী করে একটি ঘড়ির মূল্য হতে পারে।

তাহলে আসুন আজকে আমরা রোলেক্সের দাম কেন এত বেশি, তা জেনে নিই।

উইন্সটন চারচিলের রোলেক্স ডেজাস্ট; সূত্র- rolex.com

রোলেক্সের পরিচয়

১৯০৫ সালে লন্ডনে হানস উইলসডরফ ও আলফ্রেড ডেভিস রোলেক্স প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১৫
সালে এটি হয় রোলেক্স ওয়াচ অ্যান্ড কোম্পানি। এখন পর্যন্ত অনেক ধরনের রোলেক্স তৈরি
করা হয়েছে যার মধ্যে ডায়টোনা, সাবমেরিন, ডেয়জাস্ট খুবই বিখ্যাত।

নকশা

রোলেক্সের দাম এতো বেশি হবার পেছনে অন্যতম একটি প্রধান কারণ হলো এর নকশা। কয়েক ধরনের রোলেক্স হয়ে থাকে। যেমন সাবমেরিনের জন্য , পাইলটদের জন্য, বেল্ট এর বা মেকানিক্যাল বিভিন্ন ধরনের ঘড়ি রোলেক্স তৈরি করে থাকে। তাই মানের দিক থেকে ভিন্ন, আকর্ষণীয় ও অন্যান্য ঘড়িগুলো থেকে আলাদা হতে হয় এর নকশা। যার কারণে প্রতিবারেই কোন এক মডেলের ঘড়ি বাজারে ছাড়ার বহু আগে থেকেই এর নকশার উপর সময় বিনিয়োগ করা হয়। কারণ রোলেক্স যেমন ক্রেতাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেয় ঠিক সেই সাথে তারা যেন কোনো মতেই হতাশ না হয় এ বিষটির দিকেও তারা লক্ষ রাখে।

এ জন্য বছর ধরে কিংবা আরো অনেক সময় ধরে রোলেক্সের নকশা করা হয়। এই নকশা কেবল ঘড়ির উপরিভাগের নয়, উপরিভাগসহ ঘড়ির অভ্যন্তরীণ অংশসমূহ যেমন এর ডায়াল, কাচ, ডায়ালের উপর লেখা, এর বর্ণ, ডায়ালের কাটা, ভেতরের যন্ত্রপাতি এমনকি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্ক্রু যা ঘড়ির একটি অংশের সাথে আরেকটি অংশের সংযোগ ঘটায় সেটি পর্যন্ত নকশা করা হয়। সেই নকশা হাতে করার পর এটিকে একটি ডিজিটাল ফরম্যাটে নেয়া হয়। এরকম কেবল নকশার অংশটুকুই এতোটা গুরুত্বপূর্ণ ও বৈচিত্র্য। তাই রোলেক্সের প্রচুর পরিমাণ টাকা নকশাতে ব্যয় করতে হয়।

রোলেক্স সাবমেরিন হাল্ক; সূত্র- timeandtidewatches.com

কারিগরি মজুরি

ঘড়ি কারিগরদের মুল্য অনেক বেশি আর সেই ঘড়ি যদি হয় সুইটজারল্যান্ডের তাহলে
সেটি আরো যুক্তিযুক্ত। একজন ঘড়ি কারিগরের খুবই সতর্কতার সাথে তার কাজগুলো সম্পন্ন
করতে হয়। রোলেক্স ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে এটি আরো ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঘড়িতে কারিগরদের
মেশিনের সহায়তার সুযোগ কম। তাদের ঘড়ির একটি অংশের সাথে আরেকটি অংশকে হাতে জোরা
লাগাতে হয়, কারণ রোলেক্সের এর যন্ত্রাংশগুলো খুবই ক্ষুদ্র। এসব ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ
একটির সাথে আরেকটি সংযোগ ঘটানোর ক্ষেত্রে মেশিনের সহায়তা নিলে কাজ আরো নষ্ট হবার
সম্ভাবনা অনেক। তাই কারিগররা নিজেই কয়েকটি সূক্ষ্ম কাটার সাহায্যে ঘড়ির বিভিন্ন
যন্ত্রাংশ ধরে এবং তাদের কাজ সম্পন্ন করে। অত্যন্ত্ব নিখুঁত, পরিষ্কার ও
ঝুঁকিপূর্ণ কাজ তাদের সম্পাদন করা লাগে। তাই এর পারিশ্রমিকও হয় অনেক বেশি। আর এসব
কিছুই সম্মিলিতভাবে প্রভাব ফেলে মূল রোলেক্সেরে দামে।

স্টিল

রোলেক্স ঘড়ির চেইন যদি সরাসরি বা ভিডিওতে একটু মনোযোগ দিয়ে দেখে থাকেন
তাহলে দেখবেন এটি সবসময় চকচক করতে থাকে। কখনও , কোন মুহূর্তের জন্যেও এর এই
চকচকেভাব শেষ হয়না। এর পেছনে কারন হলো রোলেক্সের স্টিল। রোলেক্সের চেইন ও এর
বিভিন্ন অংশ তৈরি করতে যে স্টিল ব্যবহার করা হয় সেটি হলো ৯০৪ এল স্টিল যার গুন
বাজারে পাওয়া অন্য যেকোনো মানের স্টিল হতে বহুগুন ভালো। বাজারে সচারাচর যে দামী স্টিল
ব্যবহার করা হয় সেটি হলো ৩১৬ এল। ৯০৪ এল স্টিলের খরচ অনেক। বছরে প্রায়
৮ লাখ থেকে ১০ লাখ ঘড়ি রোলেক্স তৈরি করে থাকে। তাহলে বোঝাই
যায় যে কী পরিমাণ ভালো গুণ সম্পন্ন স্টিলের প্রয়োজন হয়।

জেমস বন্ড ও রোলেক্স; সূত্র- kronos360.com

মেকানিক্যাল ঘড়ি

মেকানিক্যাল ঘড়িসমূহ বানানো খুব সহজ নয়। এদের প্রতিটি অংশ খুব নিখুঁত ও
সতর্কতার সাথে বানাতে হয়। অনেক যন্ত্রাংশ আছে যেগুলো বেশ পাতলা ও ক্ষুদ্র। এগুলোর
পরিষ্কার করা বা জোরা  লাগাতে কারিগর নিজের
হাতই ব্যবহার করে থাকেন। আবার কোনো ক্ষেত্রে এগুলোকে ল্যাবরাটরিতেও পাঠানো হয়।
রোলেক্সের নিজেদের ‘এ’ ল্যাব ‘ডি’ ল্যাব রয়েছে। মেকানিক্যাল ঘড়ির বিভিন্ন যন্ত্রের
ঘূর্ণন ও সচল রাখার প্রক্রিয়াটিও বেশ জটিল।

প্রচার ও বিজ্ঞাপন

রোলেক্সের ট্যাগ লাইন হলো, “প্রতি অর্জনের জন্য একটি মুকুট” আর এর লোগোতেও
দেখা যায় একটি মুকুট। অর্থাৎ মানুষের অর্জনের সাথে এর একটি সম্পর্ক রয়েছে। ইতিহাসও
তাই বলে। এডমন্ড হিলারি যখন হিমালয়ের উপর দিয়ে বিমান নিয়ে উড়ে যান তখন তার হাতে
ছিল রোলেক্স। জল-রোধী রোলেক্স পরে মারসিডিস গ্লাইটজ নামে একজন সাতারু ইংলিশ
চ্যানেল অতিক্রম করেছিলেন। এটি রোলেক্স তাদের প্রচার হিসেবেও ব্যবহার করে। প্রায়
১০ ঘণ্টা সাঁতার কাটার পরও ঘড়িটির কিছুই হয় নি। ঘণ্টায় ৩০০ মেইল অতিক্রম করেছিলেন স্যার
ম্যালকম ক্যাম্পবেল তার হাতেও ছিল রোলেক্স। বিষয়টা এমন যে বিশ্বের বিভিন্ন
আন্তর্জাতিক রেকর্ড করা ব্যক্তিদের সাথে এই ঘড়িটির নাম জুড়ে আছে। বিশের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা টেনিসে
বিনিয়োগ করে রোলেক্স। তাছাড়া এবারের ক্রিকেট বিশ্বকাপেও রোলেক্স ঘড়ি বিজয়ীদের দেয়া
হয়। উইন্সটন চার্চিল থেকে শুরু করে বন্ড ফিল্মের নায়ক, টেনিস তারকা রজার ফেদারারও
রোলেক্স পরেছেন।

তাই কারিগরি মান, ইতিহাস, ঐতিহ্য নিজেদের সুনাম রক্ষার্থে রোলেক্স সবসময় সেরাটাই দিয়ে আসছে। এখন বলেন লাখ টাকা মূল্য যুক্তিসঙ্গত কিনা?   

Reference:

১. https://interestingengineering.com/ever-wondered-why-a-rolex-is-so-expensive-watch-this

২. https://www.rolex.com/about-rolex-watches/rolex-history/1926-1945.html

Featured Image: timeandtidewatches.com


Like it? Share with your friends!

0
Jahangir Alam

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *