গলতে থাকা ঘড়ির কথা


0

গলতে থাকা ঘড়ির কথা

Brand, Famous Collection, Features, Fun Facts, History

August 15, 2019

February 19, 2020

Shuvodip Biswas

আজকে একটা অদ্ভুত ঘড়ির কাহিনী বলবো। এই ঘড়ি আবার গলতে থাকা ঘড়ি। সেটা কিন্তু পৃথিবীর লৌকিক কোন জায়গায় নেই, আছে একটা পেইন্টিংয়ে। কি, বিভ্রান্তিকর লাগছে? তবে চলুন, জেনে আসি এই গলতে থাকা ঘড়ির কথা!

আমরা যারা শিল্পের ঘরানার খোঁজ-খবর রাখি, পরাবাস্তববাদী শিল্পী স্যালভাদর ডালির নাম মনে হয় মোটামুটি সবাই-ই শুনেছি। জাতে স্প্যানিশ এই শিল্পী বিংশ শতকের সবচেয়ে শক্তিশালী শিল্পীদের একজন। তাঁর আঁকার বিষয়বস্তু ছিলো ক্ষেত্রবিশেষে খুবই অদ্ভুত। ১৯৩১ সালে আঁকা স্যালভাদর ডালির একটি পেইন্টিংয়ের নাম হচ্ছে Persistence of Memory.

Salvador Dali; ছবি-­legomenon.com
এটিকে সম্ভবত ডালির আঁকা সবচেয়ে রহস্যময় ছবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ছবিটিকে এককথায় ক্লকস,
বা ঘড়ি বলেও ডাকা হয়। যে নামেই ডাকা হোক না কেন,
এই পেইন্টিংটি একটি পরাবাস্তব মাস্টারপিস। ছবিটির দিকে তাকালে দেখা যায় একটি শূন্য মরুভূমিতে কয়েকটি ঘড়ি, যেগুলো ধীরে ধীরে গলে গলে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে। চারপাশে কোন মানুষ নেই,
সামনে একটা জলাশয়,
কিছুটা দূরে বালির পাহাড়৷ গলতে থাকা এই ঘড়িগুলো দিয়ে কি বোঝানো হচ্ছে? 
Persistence of Memory; ছবি-legomenon.com
সালভাদর ডালির আঁকা এই মাস্টারপিসের পেছনের অর্থ বুঝতে পারা খুব একটা সোজা নয়। ছবির ঘড়িগুলো মোটেও স্বাভাবিক নয়,
কেন? এরা গলে গলেই বা পড়ছে কেন? জায়গাটাই বা মরুভূমি কেন, আর কোনো মানুষই বা নেই কেন? ভালোভাবে পেইন্টিংটি লক্ষ্য করলে এই প্রশ্নগুলো উঠে আসতে বাধ্য। 

সাধারণের চিন্তায় পেইন্টিংটিকে খুবই অবাস্তব কিংবা অযৌক্তিক মনে হতেই পারে, কিন্তু পেইন্টিংটিতে প্রায় ক্যামেরায় তোলা ছবির মত যে আবহটি এসেছে, তা অস্বীকার করা যাবে না, যেমনটা ডালি নিজেই তাঁর ছবিকে বলেছেন, “হাতে আঁকা ফটোগ্রাফ!” যাই হোক, পরাবাস্তববাদ বুঝতে হলে ড্রিম, বা স্বপ্নের ব্যাপারটি বোঝা জরুরী, যা দিয়ে ডালির এই পারসিসটেন্স অফ মেমরি, কিংবা বাংলায় অনুবাদ করলে, “স্মৃতির স্থিরতা” নামের এই পেইন্টিংটি যথাসম্ভব ব্যাখ্যা করা যাবে। 

মোটামুটি পরাবাস্তববাদী একটা দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে বলা যায়, পেইন্টিংটি হয়তবা কারো স্বপ্নের কোনো একটা অংশ, কিংবা কোনো স্বপ্নদৃশ্য বোঝানোর চেষ্টা করছে। প্রথম প্রথম পরাবাস্তববাদ সাধারণ মানুষের কাছে পাগলের প্রলাপের মত মনে হতেই পারে। কিন্তু আমরা সবাই-ই তো এমন সব স্বপ্ন দেখি যার কোনো মাথামুণ্ডু থাকে না, কোন জায়গাকে, কোন মানুষকে স্বপ্নে দেখছি, কেন দেখছি, কোনোকিছুই ব্যাখ্যা করা যায়৷ পরাবাস্তববাদ খানিকটা এইরকমই কাজ করে। যাই হোক, ডালির এই পেইন্টিংটিকে স্বপ্নদৃশ্য ধরে নিয়ে চিন্তা করতে গেলে হয়ত কিছু কিছু মিল পাওয়া যায়! 

যদি পেইন্টিংটি একটি স্বপ্নদৃশ্য হয়, আর গলে যাওয়া ঘড়িগুলোকে যদি সময়ের অস্থির কিংবা বিক্ষিপ্ত চলাচল ধরা হয়, তাহলে কি কিছু পাওয়া যায়? এখন অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, সময়ের অস্থির বা বিক্ষিপ্ত চলাচল হবে কেন? আচ্ছা ধরুন, আপনি রাত দুটোর দিকে ঘুমাতে গেলেন। তৎক্ষনাৎ ঘুমিয়ে পড়ে একটা লম্বা স্বপ্ন দেখলেন, মোটামুটি বিশাল একটা মুভির সমান। স্বপ্ন শেষ হলে ঘুম ভাঙলো। আপনি ভাবছেন হয়তো ভোর হয়ে গেছে, কিন্তু না! বিছানার পাশ থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে আনলক করতেই দেখলে দু’টো বিশ, কিংবা আড়াইটা বাজে! হয় না এমন? কিংবা এমনও তো হয়, কোনো স্বপ্ন দেখে হঠাৎ আপনার ঘুম ভেঙে গেলো,

স্বপ্নদৃশ্য; Source: Designboom
আপনি ভেবেছিলেন চোখ খুলে দেখবেন মধ্যরাত্রি। অথচ দেখলেন, সকাল হয়ে গেছে, পাখিরা ডাকতে শুরু করেছে। মানে, মোট কথা হচ্ছে, বাস্তব দুনিয়ায় আমাদের সময়ের যে হিসেব, স্বপ্নের দুনিয়ায় তা থাকে না। যদিও Persistence of Memory-কে আরও হাজারটা উপায়ে ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু আমরা যদি পেইন্টিংটিকে একটা স্বপ্নদৃশ্য ধরে নিই, তাহলে দেখুন, ঘড়িগুলো কিন্তু গলে যাচ্ছে। যেহেতু ঘড়িগুলো বাস্তব জীবনের সময় পরিমাপের জন্য তৈরি, স্বপ্নের জীবনে এর কোনো কার্যকারিতা নেই। গলে যাওয়া ঘড়ি দিয়ে হয়ত এই বিষয়টিই বোঝানো হয়েছে। 

অতএব, বলা যায়, পেইন্টিংটিতে সালভাদর ডালি বোঝাতে চেয়েছেন, স্বপ্নজগতে আমাদের সাধারণ সময়ের ধারণাটি কতটা ভঙ্গুর, অযৌক্তিক! কারণ, বাস্তব জীবনে তো আমরা সবসময়েই ব্যতিব্যস্ত, কিভাবে সময়টা ঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, কিভাবে সময়ের কাজ সময়ে করা যায়, কিন্তু স্বপ্নে তো আর ব্যাপারটা তেমন নয়!
যাই হোক, মজার ব্যাপার হচ্ছে পন্ডিতেরা মাঝে মাঝে তর্ক বিতর্ক করেন পেইন্টিংটিতে দেখানো ঘড়িগুলি কি পকেটঘড়ি কি না! কারণ সালভাদর ডালি যখন পেইন্টিংটি আঁকেন, তখন পকেটঘড়ির চলই বেশি ছিলো। অবশ্য পরাবাস্তববাদীরা বেশিরভাগ সময় সাধারণ মানুষের “ট্রেন্ড” নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করতেন, পকেটঘড়িও তেমনই একটি ট্রেন্ড ছিলো বৈকি। এই ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সালভাদর ডালি তাঁর পেইন্টিংয়ে ঘড়িগুলিকে এতটা অসহায় করে এঁকেছেন কি না, কে জানে! অবশ্য কেউ কেউ তো আবার আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ব দিয়েও পেইন্টিংটিকে ব্যাখ্যা করে ফেলেছেন!

কেউ একে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব দিয়েও ব্যাখ্যা করেছেন! Source: Kiwi Report
পেইন্টিংটির এক কোণায় দেখা যায়, লাল রঙের একটি গলতে থাকা ঘড়িকে পিঁপড়েরা খেয়ে ফেলছে। এটা দিয়ে মূলত ধীরে ধীরে সময়ের স্রোতকে মিলিয়ে যাওয়াকেই বোঝানো হয়েছে! অর্থাৎ কিছুই যে চিরস্থায়ী নয়, এমনকি সময়ও, সেটাই বোঝানো হয়েছে হয়তবা! 

Persistence of Memory নামের এই পেইন্টিংটিতে থাকা এই ঘড়িগুলো একদিক দিয়ে পরাবাস্তববাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে ধীরে ধীরে। একই সাথে বিংশ শতকের অন্যতম শক্তিশালী ও দামী শিল্পকর্মও যে এটি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। হয়ত একশ একটা উপায়ে পেইন্টিংটিকে ব্যাখ্যা করা যায়, কিংবা হয়ত একেবারেই করা যায় না! এরচেয়ে বরং গলে যাওয়া ঘড়ি নিয়ে আরো কয়েক সহস্র বছর মুগ্ধতা ছড়াতে থাকুক Persistence of Memory!

তথ্যসূত্র- https://­legomenon.com/­salvador-dali-persist­ence-of-memory-melti­ng-clocks-meaning.ht­ml

ফিচার ছবি-legomenon.com


Like it? Share with your friends!

0
Rimi Khan

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *