চেনা ঘড়ির অচেনা গপ্পো


0

চেনা ঘড়ির অচেনা গপ্পো

Brand, Famous Collection, Features, Fun Facts, History

July 30, 2019

February 19, 2020

Shuvodip Biswas

লালন ফকির তো সেই কবেই বলে গিয়েছেন, “সময় গেলে সাধন হবে না!”
সাধন হোক কিংবা না হোক,
কব্জিতে লাগানো হাতঘড়িটির দিকে তাকালে সময় যে চলে যাচ্ছে এটা বেশ ভালোভাবেই বোঝা যায়৷ অবশ্য লালন ফকির ঘড়ি দেখে গানটি লিখেছিলেন কি না, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য আমার জানা নেই। বরং এর বদলে ঘড়ি সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য জানানো যায়, যেগুলো খুব সম্ভবত এর আগে কেউ জানতেন না! অতএব, শুরু করা যাক!

১. জামাকাপড়ের সাথে সুন্দর সুন্দর হাতঘড়ি পরাটাও আজকাল একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এটা কি জানেন, ১৭ শতকেও ঠিক এইভাবেই জামাকাপড়ের পাশাপাশি ঘড়ি পরাটা চালু ফ্যাশন ছিলো? হ্যাঁ, ঠিক তাই, তবে সে ঘড়ি হাতঘড়ি ছিলো না, ছিলো পকেট ঘড়ি। রাজা দ্বিতীয় চার্লস স্বয়ং পকেটঘড়ি পরার এই কেতা আবিষ্কার করেন। সেকালের কেতাদুরস্ত, অর্থাৎ ফ্যাশনেবল মানুষের অন্যতম বাঁধা পোষাক ছিলো ওয়েস্ট কোট,
তার সাথে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য একটি করে পকেটঘড়ি। পকেটঘড়ি আভিজাত্যের চিহ্নও বহন করতো বটে! তবে আজকাল অভিজাত লোকেরা খুব সম্ভবত পকেটঘড়ির চেয়ে একটি রোলেক্স ঘড়িই বেশি পছন্দ করবেন! 

ছবি-pocketwatch.co.uk
২. হাতঘড়ি পরার প্রচলনটা শুরু হয় মূলত গত শতাব্দীর বিশ্বযুদ্ধগুলির কারণে। হ্যাঁ, ঠিকই দেখছেন, বিশ্বযুদ্ধগুলির কারণে। বিখ্যাত ঘড়ি প্রস্তুতকারক লুই কার্টায়ার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায়ই তার পাইলট বন্ধু আলবার্তো সান্তোসের সাথে এয়ারক্রাফটে করে ঘুরে আসতেন৷ যখন তিনি খেয়াল করলেন, সান্তোসের দুটো হাতই এয়ারক্রাফটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তিনি সঠিকভাবে সময় দেখতে পারছেন না, তখনই তিনি পাইলটদের জন্য বিশেষ একটি হাতঘড়ি বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় “অ্যাভিয়েটর” নামের হাতঘড়িটি আজ পর্যন্ত পাইলটরা ব্যবহার করে চলেছেন। 

ছবি-monochrome-watches.com
৩. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় হাতঘড়ির ব্যবহার শুধুমাত্র পাইলটদের দিয়ে শুরু হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পদাতিক বাহিনীর মধ্যেও হাতঘড়ি ব্যবহারের প্রচলন করা হয়। সৈন্যদের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিলো, যাতে তাঁরা হাতঘড়ি ছাড়া অন্য কোনো ধরনের ঘড়ি ব্যবহার না করেন। মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে যদি পকেটঘড়ি বা অন্যান্য কোনো ঘড়ি ব্যবহার করা হয়, তবে সময় দেখতে গিয়ে শত্রুপক্ষের ওপর থেকে মনোযোগ সরে যেতে পারে। আবার এক হাত দিয়ে ঘড়ি দেখে দেখে আরেক হাতে অস্ত্র চালানোটাও অসম্ভব৷ তাই হাতঘড়ি বাধ্যতামূলক করা হলো,
যাতে যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের মনোযোগও না সরে, আবার দু’হাতে অস্ত্র চালাতেও সমস্যা না হয়, পাশাপাশি সময়টাও ভালোভাবে দেখে নেয়া যায়। এক ঢিলে তিন পাখি মারা বোধহয় একেই বলে! 

৪. পুরনো আমলের ঘড়িতে দম দেয়ার ব্যাপারটি আমরা সবাই বোধহয় কমবেশি জানি। আজকাল ব্যাটারির সাহায্যে ঘড়ি চলে বলে ঘড়িতে আর দম দিতে হয় না। কিন্তু কিছু কিছু হাতঘড়ি আছে,
যেগুলো ব্যাটারির সাহায্যে মোটেও চলে না। এগুলোকে বলা হয় অটোমেটিক ওয়াচ, বা স্বয়ংক্রিয় ঘড়ি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দমও দিতে হয় না, ব্যাটারিও নেই,
তবে এই ঘড়ি চলে কিভাবে? 
আসলে অটোমেটিক ঘড়িতেও দম দেয়া হয়। তবে এসব হায়ঘড়িতে দম দেয়ার জন্য আলাদা করে কোনো ঝক্কি পোহাতে হয় না। মূলত ঘড়ি পরে হাটার সময় পরিধানকারীর হাতের দুলুনি থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব ঘড়িতে দম দেয়া হয়ে যায়। 

ছবি-timex.com
৫. দুটো বিশেষ রকমের ঘড়ি আছে, যা দুটো বিশেষ পরিস্থিতিতেই ব্যবহার করা হয়। একটি জলের তলায়, আর অন্যটি মহাসমুদ্রে৷ 
বিখ্যাত ডাইভার Jacques Cousteau ১৯৫৪ সালে একটি ডকুমেন্টারি বা তথ্যচিত্র তৈরি করেন ডাইভিং নিয়ে। ডকুমেন্টারিটির নাম ছিলো “দ্য সাইলেন্ট ওয়ার্ল্ড”। এই ডকুমেন্টারিতে ডাইভিংয়ের সময় তিনি রোলেক্স সাবমেরিনার নামে একটি ঘড়ি ব্যবহার করেছিলেন সময় দেখার জন্য৷ সেই থেকে ডাইভিংয়ের জন্য যত ঘড়িই বানানো হয়েছে, তার সবগুলিতেই এই রোলেক্স সাবমেরিনার ঘড়ির ডিজাইন থেকে কিছু না কিছু মেরে দেয়া হয়েছে, বৈধভাবে না অবৈধভাবে, কে জানে!
আবার মহাশূন্যে বিচরণের সময় এস্ট্রোনটদের প্রথম পছন্দ হচ্ছে ওমেগা স্পিডমাস্টার ঘড়িটি৷ ১৯৬৯ সালে প্রথম চন্দ্রাভিযানের সময় বাজ অলড্রিনও এই ঘড়িটিই পরেছিলেন, অতএব চাঁদের বুকে পৌছানো প্রথম ঘড়ি হচ্ছে এটা। নীল আর্মস্ট্রংয়ের কাছেও অবশ্য একই ঘড়ি ছিলো, কিন্তু তিনি তা পরতে ভুলে গিয়েছিলেন। অতএব কথা থাকলেও ঘড়িটি চাঁদের মাটিতে তাঁর প্রথম পদক্ষেপগুলোর সাক্ষী হতে ব্যর্থ হয়!

ছবি-omegawatches.com
৬. আজ আমরা যে ডিজিটাল ঘড়ি ব্যবহার করি, তাঁকে সর্বাধিক ভবিষ্যত-উপযোগী ঘড়ি বলে ধারণা করা হয়৷ বিখ্যাত ডিরেক্টর স্ট্যানলি কুব্রিক ঘড়ি প্রস্ততকারক হ্যামিলটন কোম্পানির কাছে কয়েকটি ডিজিটালাইজড টাইমপিস তৈরি করে দেয়ার অনুরোধ করেছিলেন। ঘড়িগুলি কুব্রিকের “২০০১:
আ স্পেস ওডিসি”
সিনেমাটিতে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন হয়েছিলো। এর ঠিক চার বছর পর হ্যামিলটন কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে ডিজিটাল ঘড়ি বাজারে আনে। অবশ্য তখন এর মূল্য খুব যে কম ছিলো তা নয়। সেসময় এক একটি ডিজিটাল ঘড়ি কেনার জন্য খরচ করতে হতো দু’হাজার একশ মার্কিন ডলার! 

৭. “প্যাটেক ফিলিপে ক্যালিবার ৮৯”
মডেলের ঘড়িকে বলা হয় পৃথিবীর সবচাইতে জটিল ঘড়ি। ১৯৮৯ সালে এটি তৈরি হয়। ঘড়িটি তৈরি হবার জন্য করতে হয়েছিলো পুরো পাঁচটি বছরের গবেষণা! এখানেই শেষ নয়। ঘড়িটির পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে লেগেছিলো চার বছর। প্রায় ১৮০০টি আলাদা আলাদা উপাদান দিয়ে তৈরি এই ঘড়ির মূল্য তখনই ছিলো ৫.১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর এখনকার দিনে এই ঘড়িটি কিনতে চাইলে খরচ করতে হবে ঠিক এর পাঁচগুণ টাকা!

তথ্যসূত্র
১. http://­www.thebestofprc200.c­om/­15-fun-facts-about-wa­tches-you-probably-d­idnt-know/

ফিচার ইমেজ- Wikimedia Commons


Like it? Share with your friends!

0
Akash Das

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *