জেনে নিন দাদাঘড়ির কথা – ঘড়ি


0

আজকে যদি রাস্তায় হুট করে কাউকে ধরে জিগ্যেস করেন, “ভাই, দাদাঘড়ি চেনেন?” শতকরা নব্বুই ভাগ সম্ভাবনা আছে, হয় সেই লোক বলবে, “না, চিনি না”, কিংবা এমন একটা মুখ করে আপনার দিকে তাকাবে যা দেখে মনে হবে আপনি সদ্যই পাগলাগারদ থেকে পালিয়ে এসেছেন, এবং যাকে তাকে যখন তখন ঘ্যাক করে কামড়ে দিতে পারেন। অবশ্য “দাদাঘড়ি” না বলে যদি বলেন গ্র্যান্ডফাদার ক্লক, বেশিরভাগ মানুষই একগাল হেসে উত্তর দেবেন, “হ্যাঁ! চিনি বৈকি!” একটু প্রাচীনগোছের মানুষ হলে বলতে পারেন, “দেখেওছি!” কি এই গ্র্যান্ডফাদার ক্লক? কোত্থেকে এলো? কিভাবে আবিষ্কার হলো? এর বিশেষত্বই বা কি?

antique beauty

গ্র্যান্ডফাদার ক্লককে বলা যায় ঘড়িদের গ্র্যান্ডফাদার, তা সে দামের দিক থেকেই বলুন, স্থায়ীত্বের দিক থেকেই বলুন কিংবা সাইজের দিক থেকেই বলুন৷ একটা বিশাল স্তম্ভের মত কাঠের বডি, তার ওপরের দিকে একটা মোটামুটি সাইজের ঘড়ি, ঘড়ির নিচ থেকে দুটো লোহার তৈরি বস্তু ঝুলছে আর একটা মস্তবড় পেন্ডুলাম এদিক ওদিক দুলছে। বাইরের দিক থেকে গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের একটা মোটামুটি বর্ণনা হচ্ছে এটাই৷ যাদের পরিবার একইসাথে প্রাচীন এবং বনেদী, কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে উচ্চ-মধ্যবিত্ত, তাদের হয়ত এই গ্র্যান্ডফাদার ঘড়ি স্বচক্ষে দেখার এবং তার অভিজাত ঘণ্টার “ঢং ঢং” শব্দ শুনে বড় হবার অভিজ্ঞতা থাকতে পারে। যদিও আজকাল এই বিশেষ প্রকারের ঘড়িটি দেখা যায় না বললেই চলে!

গ্র্যান্ডফাদার ঘড়ির আবিষ্কারের কথা বলতে গেলে আগে ক্লক, বা ঘড়ির আবিষ্কারের কথা বলতে হয়। প্রথম ঘড়ির আবিষ্কার বহু বহু আগে, খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে, এবং ঘড়িটি ছিলো সানডায়াল, অর্থাৎ সূর্যঘড়ি। তারপর জলঘড়ি আবিষ্কার হলো, সেটিও খুব একটা কার্যকর ছিলো না। প্রথম যান্ত্রিক ঘড়ি আবিষ্কার হয় ১৩৬০ খ্রিস্টাব্দে। তারপর আরও কিছু ঘড়ি খুচরোভাবে তৈরি করা হয়, এবং অবশেষে ১৬৫৮ সালে আমেরিকায় প্রথম পেন্ডুলামওয়ালা ঘড়ি তৈরি করা হয়। 

The Well Made Clock নামের একটি ঘড়ি কোম্পানির মতে, পেন্ডুলামওয়ালা ঘড়ি তৈরির চিন্তা সর্বপ্রথম এসেছিলো গ্যালিলিওর মাথায়, কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে তাঁর পক্ষে সেই ঘড়ি তৈরি করা সম্ভব হয়নি৷ অবশেষে ক্রিস্টোফার হিউগেনস নামে এক ভদ্রলোক গ্র্যান্ডফাদার ঘড়ি তৈরি করলেন, পেন্ডুলাম দিয়েই। ওইসময়ের অন্যান্য ঘড়ির তুলনায় এই গ্র্যান্ডফাদার ঘড়ির সময় নির্ধারণ ছিলো অপেক্ষাকৃত যথাযথ এবং নির্ভুল। 

এই গ্র্যান্ডফাদার ক্লক বস্তুটি মানুষের জীবনে অদ্ভুত একটা প্রভাব ফেললো। আগে মানুষ যেখানে সূর্যের দিকে তাকিয়ে নিজের কাজের সময় নির্ধারণ করতো, সে এখন সূর্যের বদলে ঘড়ির দিকেই তাকাতে শুরু করলো। ফলে খাওয়ার সময় খাওয়া, ঘুমের সময় ঘুম, পড়ার সময় পড়া টাইপ কাজগুলি সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যেতে লাগলো। এককথায় সামাজিকভাবেই অযথা সময় খরচের ব্যাপারটি আস্তে আস্তে উঠে যেতে থাকলো। মাঝেমধ্যেই হয়তো আমাদের অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, “সাদা চামড়ার মানুষগুলো এত পাংকচুয়াল ক্যানো ভাই?” এর উত্তরটা বোধহয় এই গ্র্যান্ডফাদার ক্লক আবিষ্কারের পরের সময়টুকুতেই লুকিয়ে আছে।

CGtrader.com

এখানে একটা মজার ব্যাপার আছে৷ সামাজিক শ্রেণিভেদে গ্র্যান্ডফাদার ঘড়ির কদর একটু ওঠানামা করতো। আচ্ছা, ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা করা যাক। উচ্চবিত্ত বা বড়লোক শ্রেণির মানুষদের ঘরগুলোও বেশ বড় বড় হয়, তাই না? ঘরের সিলিংও বেশ উঁচু উঁচু হয়। এজন্য বিশাল সাইজের গ্র্যান্ডফাদার ঘড়িগুলো তৎকালীন উচ্চবিত্তদের ঘরে ভালোভাবেই ফিট করে যেত৷ সমস্যা হত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষদের ঘরে৷ তাঁদের ঘরের সিলিং তো অতটাও উঁচু হতো না। কাজেই, এত বড় আকৃতির গ্র্যান্ডফাদার ঘড়িগুলো তাঁদের ঘরে আঁটতো না। অতএব একরকম বাধ্য হয়েই মধ্যবিত্তরা ঘড়ির আগা এবং গোড়ার দিক কেটে ফেলে কোনোমতে ঘরের আকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটা অবস্থায় এনে রাখতেন। তা সেই কাটছাট করা ঘড়ি যে বড়লোকের ঘরের ঠিকঠাক ঘড়ির চেয়ে কম কদর পাবে, তা তো বোঝাই যায়!

উচ্চবিত্তদের বাড়িতে যারা কাজ করতেন, এই গ্র্যান্ডফাদার ক্লক তাঁদের এক অলিখিত মনিব হয়ে উঠেছিলো। মালিকের কথার চেয়ে ঘড়ির ঘন্টা কিংবা ডায়াল তাঁদের বেশি খেয়াল করতে হতো৷ ঘড়িতে এতটা বাজলে এই কাজ করতে হবে, অতটা বাজলে এই কাজ করতে হবে; এক কথায় একটা অলিখিত রুটিন মেনে চলতেই হত এই ঘড়ির বদৌলতে৷ 

এখানে আরেকটা মজার গল্প বলা যাক। লেখক ফ্রেডেরিক ব্রায়ান্ট তাঁর Working Drawings of Antique Furniture বইয়ে লিখেছেন, সেসময় নিম্নমধ্যবিত্তরা নাকি এক দফায় গ্র্যান্ডফাদার ক্লক কিনতে পারতো না। দুই বা তিন দফায় কিনতে হতো। প্রথমে তাঁরা নিজেদের টাকা দিয়ে শুধু ঘড়ির ভেতরের দিকের কলকব্জা কিনতেন, এতেই মোটামুটি সেই সময়ের জন্য তাঁদের ঘড়ির বাজেট শেষ হয়ে যেত৷ তারপর আবার কিছুদিন টাকা জমিয়ে স্থানীয় কোনো মিস্ত্রিকে ডেকে তাকে দিয়ে ঘড়ির জন্য একটি কাঠের বডি বানাতেন। তারপর সেই বডির ভেতর ঘড়ির কলকব্জা ঢুকিয়ে মোটামুটি মানের একটি গ্র্যান্ডফাদার ক্লক বানিয়ে নিতেন৷ যদিও বড়লোকের বাড়ির গ্র্যান্ডফাদার ঘড়িগুলির সাথে এর তুলনাই হত না। দুই দফায় বানানো এসব ঘড়ি ওসব দামী ঘড়ির চেয়ে অবশ্যই অনেক কম চকচকে এবং কম টেকসই ছিলো। উচ্চবিত্তদের বাড়ির ঘড়িগুলো ভালো মানের কাঁচামাল এবং কাঠ দিয়ে তৈরি হত। কাজেই, নিম্নমধ্যবিত্তদের বাড়ির ঘড়িগুলোতে খুব তাড়াতাড়িই বয়সের ছাপ পড়তে শুরু করতো। 

গ্র্যান্ডফাদার ক্লকগুলো নানারকমের হত। কোনোটার মাথা হত চ্যাপ্টা, কোনোটার দোচালা, কোনোটার আবার চোখা। পেন্ডুলামের দুলুনির সাথে সাথে একটা নির্দিষ্ট গতিতে লোহার তৈরি বস্তুগুলো আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামতে থাকতো। পেন্ডুলামের এই দুলুনি, আর লোহার বস্তুগুলোর নিচে নামা, দুটো একসাথে ঘটার কারণেই ঘড়ির কাঁটাগুলো একেবারে ঠিকঠাক গতিতে চলতে থাকতো। বিশাল হিসাবের ব্যাপার, তাই না?

Shpock

আজকাল অবশ্য আর গ্র্যান্ডফাদার ক্লক তেমন একটা দেখা যায় না। তার বদলে ডিজিটাল ঘড়ি, দেয়ালঘড়ি, হাত ঘড়ি, বহু রকমের ঘড়ি চলে এসেছে। তাই গ্র্যান্ডফাদার ক্লক হয়ে উঠেছে রীতিমতো অ্যান্টিক একটা জিনিস। তবে সামাজিকভাবে নিজেদেরকে সময়ানুবর্তি করে তোলার জন্য পশ্চিমারা এই দাদাঘড়িকে বহুদিন তাদের ইতিহাস এবং মন, দুটোতেই জায়গা দিয়ে রাখবে, এমনটা আশা করাই যায়! 

তথ্যসূত্র

১.https://medium.com/­@bookish_girls/­the-history-and-signi­ficance-of-the-grand­father-clock-854b3f5­9dce5

২. https://­homesteady.com/­facts-4911754-facts-g­randfather-clocks.ht­ml


Like it? Share with your friends!

0
Josim Uddin

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *