যে ঘড়ির শব্দে গোটা শহর জাগতো: ১ম পর্ব – ঘড়ি


0

হাতের কব্জিতে যে ঘড়িটি পরা থাকে, তাতে মানুষ সময় দেখে। বাসার দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটিতেও সময় দেখে কেউ। কেউ কেউ মোবাইলের ঘড়িতেও সময় দেখে। কিন্তু এমন কি কোনো ঘড়ি আছে, যাতে গোটা একটা শহরের মানুষ সময় দেখে? হ্যাঁ, বেশ অনেকগুলোই আছে। গোটা শহরের সময় দেখার জন্য বিশাল বিশাল এই ঘড়িগুলো তৈরি করে বিশাল বিশাল ঘন্টা সমেত একটা উঁচু দালানের ওপর বসিয়ে দেয়া হয়, তাকে বলে টাওয়ার ক্লক। ঘন্টায় ঘন্টায় এই ঘন্টাগুলো বাজে, আর তা থেকেই শহরের মানুষ সময় জানতে পারে। গোটা বিশ্বের এমন কিছু টাওয়ার ক্লকই এই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু। 

Source: unsplash.com

বিগ বেন (এলিজাবেথ) টাওয়ার, লন্ডন, যুক্তরাজ্য

প্রথমেই বলে রাখতে হয় এই ক্লক টাওয়ারের নাম কিন্তু বিগ বেন নয়। বিগ বেন মূলত এর ঘন্টার নাম, কিন্তু লোকমুখে চলতে চলতে ধীরে ধীরে পুরো ঘড়িটির নামই বিগ বেন হয়ে গেছে৷ যাই হোক, এই বিশাল টাওয়ার ক্লকটি লন্ডনের হাউজ অফ পার্লামেন্টের উত্তরের কোণায় অবস্থিত। ২০১২ সাল পর্যন্ত টাওয়ারটিকে সেন্ট স্টিফেন’স টাওয়ার বলেই ডাকা হতো। ২০১২ সালে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের হীরক জয়ন্তী, অর্থাৎ সিংহাসনে বসার ষাট বছর উপলক্ষে টাওয়ারটির নাম এলিজাবেথ টাওয়ার রাখা হয়।

এই টাওয়ারের ঘড়িটির ঘন্টার কাঁটার দৈর্ঘ্য ৯ ফুট, মিনিটের কাঁটার দৈর্ঘ্য ১৪ ফুট। টাওয়ারটি মাটি থেকে প্রায় ৩২০ ফুট লম্বা। ঘড়িটির ঘন্টা, অর্থাৎ বিগ বেনের ওজন প্রায় ১৩.৭ মেট্রিক টন। রয়াল গ্রিনিচ অবজারভেটরির সহায়তায় ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন ১৯২৪ সাল থেকে রোজ এই ঘন্টার আওয়াজ প্রচার করে আসছে। 

বিশাল এই ঘড়িটি ডিজাইন করেছিলেন স্যার এডমান্ড ব্যাকেট, সহায়তায় ছিলেন স্যার জর্জ এয়ারি। ঘড়িটি তৈরি করেছিলেন এডওয়ার্ড ডেন্ট৷ ১৮৫২ সালে ঘড়িটির নির্মান কাজ শুরু হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঘড়িটির কাজ শেষ হওয়ার আগেই ডেন্ট মারা যান। তখন তাঁর বদলে কাজ শুরু করেন তাঁরই ছেলে ফ্রেডেরিক ডেন্ট। ঘড়ি এবং ঘন্টা, দুটোকে প্রথমবারের মত একসাথে স্থাপন করা হয় ১৮৫৯ সালে। বেশিরভাগ ইতিহাসবিদদের মতে, কর্ম-পরিদর্শক স্যার বেঞ্জামিন হলে নামানুসারে ঘন্টাটির নাম রাখা হয় বিগ বেন।

Source: The Conversation

যা-ই হোক, ঘড়ি ঘন্টা এক করে ঘন্টা বাজাতে যেতেই সেটাতে দেখা দিলো বিশাল এক ফাটল। অতএব, ঘন্টা বাতিল। সেই ঘন্টা ফেলে দিয়ে আরেকটি ঘন্টা বানানো হলো, বানালেন জর্জ মিয়ার্স। ১৬ ঘোড়ার ওয়াগনে করে টেমসের ওপরে ওয়েস্টমিনিস্টার ব্রিজ দিয়ে সেই ঘন্টা টাওয়ারে নিয়ে এসে ঠিকঠাক করে তৈরি করা হলো, কিন্তু বিধি বাম! আবারও ঘন্টা বাজাতে না বাজাতেই বিশাল বড় ফাটল! এবার ঘন্টা না পালটে মেরামতের কাজে লাগানো হলো৷ ১৮৬২ পর্যন্ত টানা মেরামত হলো, তারপর অবশেষে একদিন ঘন্টা বাজলো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অবশ্য ঘন্টাটি বাজানো বন্ধ রাখা ছিলো, যাতে শত্রুরা প্লেন থেকে ঘন্টার শব্দে হাউজ অফ পার্লামেন্ট শনাক্ত করতে না পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও একই কারণে ঘন্টা বাজানো বন্ধ ছিলো। ১৯৩৪ আর ১৯৫৬তেও ঘন্টা বাজানো বন্ধ ছিলো, তা অবশ্য মেরামতের জন্য। ২০১৭ সাল থেকে আবারও বিগ বেন বাজানো বন্ধ করা হয়েছে, কিছু পুনর্স্থাপন কাজের জন্য। তবে বিশেষ বিশেষ সময়ে ঘন্টাটি বাজানো হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অতএব, আপাতত বন্ধ ঘন্টা নিয়ে সগৌরবে টেমসের তীরে দাঁড়িয়ে আছে বিগ বেন। 

প্রাগের অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ক্লক, প্রাগ, চেক প্রজাতন্ত্র

প্রাগের অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ঘড়িটি সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো তিনটি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ঘড়িগুলির একটি, এবং একমাত্র চলমান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ঘড়ি৷ পঞ্চদশ শতাব্দীতে ঘড়িটি তৈরি করা হয় বলে জানা যায়। ঘড়িটির নির্মাণ বিষয়ে নানারকম গুজব শোনা যায়। এদের মধ্যে যে গুজবটি সবচে পাকাপোক্ত, সেটি অনেকটা এরকম-

Source: The Vintage News

পঞ্চদশ শতাব্দীতে প্রাগ শহরের উপদেষ্টারা শহরের জন্য একটি ঘড়ির প্রয়োজনীয়তা বোধ করলেন। সেই সময়ে প্রাগে একজন দক্ষ ঘড়ি নির্মাতা ছিলেন, যার নাম হানুস। উপদেষ্টারা তাঁকেই ঘড়িটি নির্মানের দায়িত্ব দিলেন। হানুস খুব ভালোভাবেই ঘড়িটি নির্মাণ করলেন। উপদেষ্টারা ঘড়ি দেখে যেমন আনন্দিত হলেন, তেমনি সন্দিহানও হলেন৷ তাঁরা ভাবলেন, এই ঘড়িটির মত আরেকটি ঘড়ি যদি হানুস অন্য কোনো শহরে বানিয়ে দেয় তাহলে তাঁদের শহরের মানুষের আর মুখ দেখাবার জায়গা থাকবে না। তাই তাঁরা ফন্দি আটলেন, হানুসের চোখে লোহা ঢুকিয়ে তাকে অন্ধ করে দেবেন। 

হানুস অবশ্য তাঁদের মতলব ধরে ফেলেছিলো। তবুও নিজের সীমাবদ্ধতার কারণে সে পালাতেও পারেনি, উপদেষ্টাদের বাধাও দিতে পারে নি। তবে অন্ধ হওয়ার পরে সে তার সহকারীর সাহায্যে ঘড়ির কাছে গিয়ে কোনো এক বিচিত্র উপায়ে ঘড়িটা অচল করে রেখে দিয়েছিলো, প্রতিশোধ নেবার জন্য। তারপরে প্রায় একশ বছর পর্যন্ত সেই ঘড়ি আর চলে নি।

যাই হোক, ওপরের এই ঘটনাটি শুধুই একটি মিথ। ১৯৬১ সালে ঘড়িটির অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ডায়ালটি কিভাবে কাজ করে সে সম্পর্কিত একটি পুঁথি আবিষ্কৃত হয়েছিলো। সেই পুঁথিতেই লেখা ছিলো যে, ১৪১০ খ্রিস্টাব্দে কাদান শহরের মিকুলাস নামক জনৈক ঘড়ি নির্মাতা এই ঘড়িটি নির্মান করেছিলেন৷ 

Source: DocumentaryTube

নির্মাণের পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রাগের এই ঘড়িটি তেমন একটা নষ্ট হয়নি। তাও বেশ কয়েকবার একে মেরামত করতে হয়েছে। বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দীতে যখন ঘড়িটি চলা বন্ধ হয়ে যায়, তখন এটির কিছু অংশ পালটে ফেলার কথাও চিন্তা করা হয়েছিলো। অবশেষে ১৮৬৫ সালে এটি মেরামত করা হয়। 

ঘড়িটিতে যখন ঘণ্টা বাজে, তখন এর চারপাশে রাখা ভাস্কর্যগুলো ধীরে ধীরে নড়তে শুরু করে। প্রত্যেকটি ভাস্কর্য আলাদা আলাদা বিষয়কে সংজ্ঞায়িত করে৷ যেমন, বালিঘড়ি হাতে নড়তে থাকা ভাস্কর্যটি মৃত্যুর প্রতীক, আয়না হাতে ভাস্কর্যটি অহংকারের প্রতীক, ইত্যাদি। সবগুলো ভাস্কর্যই যে নড়ে তা নয়, কিছু কিছু ভাস্কর্য অনড় থাকে। 

ও আচ্ছা! ঘড়ির নামটাই তো বলা হয়নি। প্রাগের অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ঘড়িটির একটি বিচিত্র নাম আছে। সেটি হচ্ছে- ওর্লোজ!

Source: clocktower

এখানেই শেষ নয়! আরও বেশ কিছু বিশাল বিশাল ক্লক টাওয়ার ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানান জায়গায়। অন্যান্য ক্লক টাওয়ারগুলো নিয়ে কথা বলা হবে আগামী পর্বে….

তথ্যসূত্র-

১. https://­www.ba-bamail.com/­content.aspx?emailid=­19401
২. https://­www.britannica.com/­topic/­Big-Ben-clock-London
৩. https://­www-thevintagenews-co­m.cd/

ফিচার ছবি- unsplash.com


Like it? Share with your friends!

0
Josim Uddin

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *