যে ঘড়ির শব্দে গোটা শহর জাগতো: ২য় পর্ব – ঘড়ি


0

এর আগের পর্বটিতে লন্ডন আর প্রাগে অবস্থিত দুটি টাওয়ার ক্লক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিলো। এই পর্বটিতে তেমনই আরও কিছু টাওয়ার ক্লকের কথা তুলে ধরা হলো-

Source: clocktower

মক্কা রয়্যাল ক্লক টাওয়ার, মক্কা, সৌদি আরব

মক্কা রয়্যাল ক্লক টাওয়ারটি আবরাজ আল বাইত টাওয়ার নামেও পরিচিত। মসজিদ আল-হারামের পাশেই এই টাওয়ারটি অবস্থিত। মূলত টাওয়ারটি একটি বিশাল হোটেল৷ ২০০৪ সালে এই টাওয়ারটির নির্মান কাজ শুরু হয় এবং ২০১২তে শেষ হয়। 

মূল টাওয়ারটির চারপাশে ছোট ছোট আরও পাঁচটি টাওয়ার আছে। তবে মূল টাওয়ারটির উচ্চতা প্রায় ছ’শো এক মিটার, যা টাওয়ারটিকে পৃথিবীর উচ্চতম দশটি ভবনের একটি হিসেবে স্থান করে দিয়েছে। মূলত শহরের আধুনিকায়ন এবং হজ্বযাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করার জন্যই বিশাল এই ভবনটি তৈরি হয়েছে। সৌদি বিন লাদেন গ্রুপ এই টাওয়ারটি তৈরি করে৷ টাওয়ারটির ডিজাইন করার জন্য এর স্থপতি দার আল-হান্দাসাহকে ২০০১ সালে পুরস্কৃত করা হয়৷

Source: ba-bamail.com

টাওয়ারটি প্রায় ২১.৫ মিলিয়ন বর্গফুট জায়গার ওপর নির্মিত। এই টাওয়ারের রাস্তা তৈরির জন্য এর পাশেই অবস্থিত অটোমান যুগে তৈরি দুর্গটি ভেঙে ফেলা হয়। মূল টাওয়ারটির পাশের ছোট টাওয়ারগুলির উচ্চতা দু’শো থেকে তিনশো মিটারের মধ্যে। এগুলোতে মোটামুটি ৪২ টি থেকে ৪৮ টি পর্যন্ত তলা আছে,
যেখানে মূল টাওয়ারটিতে তলার সংখ্যা ১২০টি।

মূল টাওয়ারটি পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু হোটেল এবং একইসাথে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ক্লক টাওয়ার হিসেবে স্বীকৃত। এই টাওয়ারের চারদিকে একটি করে ঘড়ির সংখ্যা চারটি। ঘড়িগুলির প্রতিটির ক্ষেত্রফল হচ্ছে ৪৩×৪৩ বর্গমিটার৷ বর্তমানে এ ঘড়িগুলিই পৃথিবীর সবচাইতে বড় ঘড়ি। প্রত্যেকটি ঘড়ির চারপাশে প্রায় দুই মিলিয়ন এল ই ডি বাতি লাগানো আছে, যাতে করে ঘড়ি দেখতে কোনো সমস্যা না হয়। 
রাথাউস-গ্লোকেন্সপিল,­ মিউনিখ, জার্মানিঃ

মিউনিখের নিউ টাউন হল স্কয়ারে প্রায়ই বেলা এগারোটা কিংবা বিকেল পাঁচটার দিকে দেখা যায় প্রচুর মানুষ দাঁড়িয়ে সোজা ওপরের দিকে তাকিয়ে আছে। এমন কি আছে ওপরে? তেমন কিছু না, ২০৬ মিটার একটা টাওয়ারের ওপরে একটা বিশাল ঘড়ি রাখা, অন্যান্য সব ক্লক টাওয়ারের মতই। তবে এই ক্লক টাওয়ারের একটা বিশেষত্ব আছে। এই ক্লক টাওয়ার গল্প বলে। 

Source: ba-bamail.com

টাওয়ারটিতে দুটো তাক আছে। দুটো তাকে সব মিলিয়ে তেতাল্লিশটি ঘন্টা আর অনেকগুলি মানুষের মূর্তি রাখা আছে। ঘন্টা বাজলেই একেকটা তাকে একেকটা গল্প দেখানো হয় সেই মূর্তিগুলোর সাহায্যে, আর ঘন্টাগুলোর সাহায্যে বাজানো হয় আশ্চর্যরকম মিষ্টি সুর। প্রথম তাকটিতে দেখানো হয় ডিউক পঞ্চম উইলহেলমের সাথে রেনাটা অফ লরেইনের বিয়ের গল্প৷ দ্বিতীয় তাকটিতে থাকে শ্যাফলারট্যাঞ্জ নামের একটি অনুষ্ঠান পালনের চিত্র৷ দুটি তাকের মূর্তিগুলোর পরিবেশনা শেষ হতে প্রায় পনেরো মিনিট মত লাগে। ১৯০৮ সালে ঘড়িটি স্থাপিত হবার পর থেকেই প্রতিদিন এই গল্প দেখানো চলে আসছে। 

ওল্ড জো, ইউনিভার্সিটি অফ বার্মিংহাম, আমেরিকা

ওল্ড জো ক্লক টাওয়ারটির পুরো নাম হচ্ছে জোসেফ চেম্বারলাইন ক্লক টাওয়ার। এই টাওয়ারটি ১৯০৮ সালে নির্মিত হয়। ৩২৮ ফুট উঁচু টাওয়ারটির মাথা অবস্থিত ঘড়িটি বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চতায় অবস্থিত ঘড়ি হিসেবে গণ্য করা হয়। সতেরো ফুট লম্বা ডায়ালওয়ালা এই ঘড়িটি যার স্মরণে নির্মিত হয়, সেই জোসেফ চেম্বারলাইন ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম চ্যান্সেলর বা আচার্য। 

Source: ba-bamail.com

গত ১১৩ বছর ধরে শুধু সময় দেখানো ছাড়াও নানা কাজে ক্লক টাওয়ারটি ব্যবহৃত হয়েছে। এই ঘড়িতেই সর্বপ্রথম জে.বি জয়স ডায়াল ব্যবহৃত হয়। টাওয়ারটি মূলত ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের কাজের জন্য তৈরি হয়েছিলো, যাতে করে এখানে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো যায়৷ ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে সামনে রেখে এখানেই সর্বপ্রথম রাডার নিয়ে গবেষণা হয়েছিলো । গত কয়েক বছর ধরে টাওয়ারটিকে জলাধার হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

দ্য স্যাভিওর টাওয়ার, মস্কো, রাশিয়া

মস্কোর বিখ্যাত রেড স্কয়ারে অবস্থিত ৭১ মিটার লম্বা স্যাভিওর টাওয়ারটির নকশা করা হয় ১৪৯১ সালে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণভাবে তৈরি হয় ১৬২৫ সালে। ক্লক টাওয়ারটি সেইন্ট বাসিলের ক্যাথেড্রালের পাশে অবস্থিত, এবং ক্রেমলিনের দেয়ালের একটা অংশ এই টাওয়ারটি আগলে রাখে। রাশিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাগুলোর মধ্যে স্যাভিওর টাওয়ার একটি। 

Source: ba-bamail.com

দ্য পীস টাওয়ার, অটোয়া, কানাডা

Source: ba-bamail.com

বিজয় এবং শান্তির টাওয়ার (দ্য টাওয়ার অফ ভিক্টরি অ্যান্ড পীস) হিসেবে খ্যাত এই বিশাল ক্লক টাওয়ারটি অটোয়ার মাঝখানের ব্লকটির একেবারে মাঝখানে অবস্থিত। ৩০২ ফুট লম্বা এই ক্লক টাওয়ারটি খুব বেশি পুরনো নয়। ১৯১৬ সালে একই জায়গায় অবস্থিত ভিক্টোরিয়া টাওয়ারটি পুড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর এই টাওয়ারটি তৈরি করা হয়।। 

রাজাবাই ক্লক টাওয়ার, মুম্বাই, ইন্ডিয়া

রাজাবাই ক্লক টাওয়ারটি মুম্বাই ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে অবস্থিত। এই টাওয়ারটি প্রায় ২৮০ ফুট উঁচু৷ টাওয়ারটি ডিজাইন করেছিলেন ইংরেজ স্থপতি স্যার জর্জ গিলবার্ট স্কট। ১৮৭৮ সালে এই টাওয়ারটির নির্মান কাজ শেষ হয়।

Source: ba-bamail.com

উঁচু উঁচু দালানের ওপর ঘড়ি বসানোর বুদ্ধিটা যদিও প্রাচীন, তবুও ক্লক টাওয়ারগুলোকে মানবসভ্যতার এক অদ্ভুত আশ্চর্য বলা যায়৷ ভেবে দেখুন তো,
এই ক্লক টাওয়ারগুলো না থাকলে একটা গোটা শহরকে একইসাথে সময় কে বলে দিতো? 

তথ্যসূত্র-

১. https://­www.ba-bamail.com/­content.aspx?emailid=­19401
২. https://­www.designbuild-netwo­rk.com/projects/­makkah-royal-clock-to­wer-mecca/
৩. https://­www.destination-munic­h.com/­munich-glockenspiel.h­tml
৪. http://­www.smithofderby.com/­the-old-joe-clocktowe­r/

ফিচার ছবি- clocktower


Like it? Share with your friends!

0
Josim Uddin

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *