হাতঘড়ির দু’টি ছেলে: ক্রোনোগ্রাফ আর ট্যাকিমিটার: ২য় পর্ব – ঘড়ি


0

“ঘড়িতে ঘন্টা মিনিট সেকেন্ডের কাঁটা ছাড়া আর কিছু থাকে কি? বেশি হলে একটা অ্যালার্ম থাকে। আর কিছু তো থাকে না। মোটকথা সময় দেখা ছাড়া ঘড়ির আর কাজই নেই!”

যাদের মাথায় উক্ত কথাটি খেলা করে, তাঁদের ধারণা যে সম্পূর্ণ ভুল, সেটা এই লেখার ১ম পর্বে অনেকটা বলেছিলাম। ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ডে­র কাঁটা ছাড়াও দুটি অসাধারণ পরিমাপক যন্ত্র বেশিরভাগ ঘড়িতে দেয়া থাকে,
ক্রোনোগ্রাফ বা স্টপওয়াচ, আর ট্যাকিমিটার। 

Source: artofmanliness.co­m

ক্রোনোগ্রাফের ব্যবহার আর ট্যাকিমিটারের দুয়েকটা ব্যবহার নিয়ে গত পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এ পর্বে ট্যাকিমিটারের আরও কিছু ব্যবহার দেখে নেয়া যাক!

গত পর্বে ১ মাইল অতিক্রান্ত দূরত্বের জন্য ট্যাকিমিটার ব্যবহার করে ঘন্টায় কোনো বস্তুর গতিবেগ কত হবে তা নির্ণয় করা হয়েছিলো। তার সাথে একটা প্রশ্নও জুড়ে দেয়া হয়েছিলো, মাইল না হয়ে কিলোমিটারের হিসাব হলেও কি ট্যাকিমিটারটি কাজ করবে?

হ্যাঁ, কাজ করবে, যেহেতু ট্যাকিমিটার একটা নিরপেক্ষ স্কেল। যেমন, ধরি, রেস ট্র্যাকে দুটা বিন্দুর মধ্যে দূরত্ব এক কিলোমিটার। আগের মতই গাড়ি বিন্দু ১ অতিক্রম করলে ক্রোনোগ্রাফ চালু এবং বিন্দু ২ অতিক্রম করলে বন্ধ করে দেয়া হলো। দেখা যাচ্ছে, বিন্দু ১ থেকে বিন্দু ২ পর্যন্ত যেতে গাড়ির সময় লেগেছে ২০ সেকেন্ড। ২০ সেকেন্ডের দাগের পাশে যেহেতু ক্রোনোগ্রাফের মান ১৮০ দেয়া, অতএব গাড়ির গতিবেগ ছিলো ঘন্টায় ১৮০ কিলোমিটার। 

Source: artofmanliness.co­m

১ মাইল বা ১ কিলোমিটারের কম দূরত্বের জন্য কি গতিবেগ পরিমাপ করা যাবে? হ্যাঁ, তাও করা যাবে। 

ধরি, ওই রেসিং ট্র্যাকেই দুটা বিন্দুর দূরত্ব কোয়ার্টার কিলোমিটার, বা ১/৪ কিলোমিটার। আবারও গাড়ি বিন্দু ১ অতিক্রম করতেই ক্রোনোগ্রাফ চালু ও বিন্দু ২ অতিক্রম করতেই ক্রোনোগ্রাফ বন্ধ করে দেয়া হলো। এবার দেখা যাচ্ছে, প্রথম বিন্দু থেকে দ্বিতীয় বিন্দু অতিক্রম করতে লেগেছে ১৬ সেকেন্ড। ১৬ সেকেন্ডের দাগের পাশে ট্যাকিমিটারের মান দেয়া আছে ২২৫। তাহলে কি গতিবেগ ঘন্টায় ২২৫?
না!

যেহেতু বিন্দু দুটির দূরত্ব ছিলো কোয়ার্টার কিলোমিটার, বা এক কিলোমিটারের চারভাগের একভাগ, কাজেই ২২৫ এর চারভাগের একভাগ বের করলেই গতিবেগ পাওয়া যাবে৷ এক্ষেত্রে উত্তর হচ্ছে ৫৬.২৫। অতএব, গাড়ির গতিবেগ ৫৬.২৫ কিলোমিটার/ঘন্টা। 

এখন মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, ঘড়িতে তো সেকেন্ডের দাগ ষাটটা দেয়া আছে। তাহলে ষাট সেকেন্ড পেরোবার পর কাঁটা যখন আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবে, তখন কি ট্যাকিমিটার দিয়ে পরিমাপ করা যাবে? 

উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, যাবে। কীভাবে?

Source: artofmanliness.co­m

এজন্য অল্পস্বল্প মাথা খাটাতে হবে আরকি। ধরলাম, সেই আগের রেসিং ট্র্যাকেই বিন্দু ১ থেকে বিন্দু ২ পর্যন্ত ১ কিলোমিটার দূরত্ব যেতে একটি গাড়ির সময় লাগলো ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড, বা ৯৪ সেকেন্ড। এক্ষেত্রে গড় গতিবেগ কত হতে পারে? 
যেহেতু ৯৪ সেকেন্ড অনেক বড় সময়, আর এত বড় সময় ট্যাকিমিটারে পরিমাপ করা যায় না, কাজেই প্রথমে এই সময়কে অর্ধেক করে ফেলতে হবে। এখন গাড়ি ৯৪ সেকেন্ডে ১ কিলোমিটার গেলে তার অর্ধেক সময়, অর্থাৎ ৪৭ সেকেন্ডে গিয়েছে আধ কিলোমিটার।

৪৭ সেকেন্ড সময় যেহেতু ট্যাকিমিটারের আওতার ভেতরে, অতএব ৪৭ সেকেন্ডের দাগের পাশে ট্যাকিমিটারের মান পাই ৭৫। এবার, যেহেতু আগে সময় এবং দূরত্ব অর্ধেক করে দেয়া হয়েছিলো, সেহেতু ট্যাকিমিটারের মানটিকেও অর্ধেক করে দিয়ে পাই ৩৭.৫। কাজেই, গাড়ির গতিবেগ ছিলো ঘন্টায় ৩৭.৫ কিলোমিটার।

কোনো বস্তুর তৈরির হার পরিমাপে ট্যাকিমিটারের ব্যবহার- 

কোনো কোম্পানিতে এক ঘন্টায় কতগুলো বস্তু তৈরি হচ্ছে, তাও মাপা যায় ট্যাকি মিটারের সাহায্যে। ধরি, কোনো সাবান কোম্পানিতে ঘন্টায় কতগুলো সাবান তৈরি হচ্ছে তা বের করতে হবে। এজন্য প্রথমেই একটি সাবান তৈরিতে কতক্ষন সময় লাগছে তা বের করতে হবে। ধরি, একটি সাবান তৈরি করে বের করতে সময় লাগছে ৫৫ সেকেন্ড। ঘড়িতে ৫৫ সেকেন্ডের দাগের পাশে ট্যাকিমিটারের মান ৬৫ দেয়া আছে। অতএব, ১ ঘন্টায় ৬৫টি করে সাবা তৈরি করা হয়।

দূরত্ব পরিমাপে ট্যাকিমিটারের ব্যবহার

ট্যাকিমিটার দিয়ে কোনো চলমান বস্তু কতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করেছে, তাও জানা যায়। এক্ষেত্রে বস্তুর গতি মোটামুটি ধ্রুবক থাকতে হবে। ধরা যাক, একটি গাড়ি ৫৫ কিলোমিটার/ঘন্টা গতিবেগে চলছে। এবার ক্রোনোগ্রাফটি চালু করে দিতে হবে। যেই মুহূর্তে ক্রোনোগ্রাফের কাঁটাটি ট্যাকিমিটারের স্কেলে (ঘড়ির নয়, ট্যাকিমিটারের!) ৬৫ অতিক্রম করবে, সেই মূহুর্তেই অতিক্রান্ত দূরত্ব এক কিলোমিটার হবে। ট্যাকিমিটারের স্কেলে ৬৫-র দাগের পাশে সেকেন্ডের মান ৫৫। অতএব, গাড়িটি ৫৫ সেকেন্ডে এক কিলোমিটার অতিক্রম করেছে। 

Source: artofmanliness.co­m

ঘড়ির সাথে এমন সুন্দর দু’টা মেজারিং টুল, বা পরিমাপক যন্ত্র দেয়া আছে, সেটা হয়ত অনেকে কল্পনাও করতে পারতেন না। কিন্তু আশা করাই যায়, আজকের পর থেকে রেস দেখতে গেলে কোনো একটি গাড়ির গতিবেগ মাপার জন্য, কিংবা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গার দূরত্ব বের করার জন্য ট্যাকিমিটারটি ব্যবহার করা, কিংবা সময় রেকর্ড করার জন্য ক্রোনোগ্রাফটি কাজে লাগানো খুব একটা কঠিন কাজ হবে না! 

তথ্যসূত্র- https://­www.artofmanliness.co­m/articles/­use-chronograph-tachy­meter-wristwatch/

ফিচার ছবি- artofmanliness.co­m


Like it? Share with your friends!

0
Rimi Khan

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *